
স্বপ্নগুলো এখন শুধুই সাদা আর কালো..। বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনে ছররা গুলির আঘাতে দুই চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে ফেলা রাকিবুল ইসলাম। চোখে কালো চশমা পড়ে ২৪ বছর বয়সি এই যুবকের বিষণ্ন দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়।
আগারগাঁও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিছানায় বসে কথা হয় রাকিবুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, লাইটের আলোতে সবকিছু সাদা দেখায়, যা চোখে খুব অস্বস্তি দেয়, তবে কালো চশমাটা চোখে দিয়ে সবকিছু কালো দেখা গেলেও, সেটাই চোখকে একটু প্রশান্তি দেয়। ‘সেই ১৮ জুলাই থেকেই আছি এই হাসপাতালে, চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। চিকিৎসক বলেছেন, এক চোখে হয়তো ২০ থেকে ২৫ ভাগ দৃষ্টি ফিরে পাব। এখন দেখা যাক, ভাগ্যে কি লিখেছেন সৃষ্টিকর্তা।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রাকিবুল বলেন, ‘১৮ জুলাই উত্তরা বিএনএস ওভারব্রিজের নিচ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের প্রথমে সরে যেতে বলে, এর তিন চার মিনিটের মধ্যেই তারা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে টিয়ারসেল, রাবার বুলেট এবং ছররা গুলি ছোঁড়ে। ঐ দিন তাদের টার্গেট ছিল আন্দোলনকারীদের চোখ, মুখ, বুক আর মাথা। একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে থেকে র্যাব একসঙ্গে যেভাবে গুলি ছুঁড়েছে, যা বলে বোঝানো যাবে না। ওদের ভেতরে কোনো মানবিকতা ছিল না। একেক জন মানুষকে মনে হয়েছে যেন গুলি ছোঁড়ার যন্ত্র। সেই সময় আন্দোলনরত সবার সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেখানে আনুমানিক বেলা পৌনে ১১টার দিকে আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হই। বন্ধুরা আমাকে প্রথম উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেয়, সেখানে থেকে বাংলাদেশ আই হসপিটাল, এরপর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইসস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে আসে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতাল এবং বাসায় আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম, এরপর ৬ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হই।
মা রেশমা আক্তার বলেন, আমার তিন ছেলে এক মেয়ে, রাকিবুল বড় ছেলে। বড় মেয়েকে মাস্টার্স পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। ছোট দুই ছেলের একজন অটো চালানোর কাজ শিখছে। বড় ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছিলাম, তাকে ঘিরেই ছিল আমাদের যত আশা। ওর বাবা গাড়ির মিস্ত্রী।
রাকিবুল ইসলাম লেখাপড়ার খরচ চালাতে ছোট একটা চাকরি করতেন। তার চোখের চিকিত্সায় বর্তমানে এই হাসপাতালে কোন খরচ লাগছে না। তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতার সময় চোখে আঘাত পেয়ে এখনো বেশ কজন ভর্তি আছেন। তাদের প্রয়োজন মতো অস্ত্রোপচার চলছে। অনেকের অভিযোগ, তাদের চোখে অপারেশন করতে দেরি হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে চোখকে অপারেশনের জন্য প্রস্তত করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ই নেওয়া হচ্ছে। এখন যারা ভর্তি আছেন, তাদের বেশির ভাগ বয়সে তরুণ, বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর। চার থেকে ছয় মাস পরে বোঝা যাবে তাদের চোখের দৃষ্টি কতটুকু আছে বা থাকবে।
