
এক বছর আগ থেকে দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচক নেতিবাচক হতে শুরু করে। সার্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে সংকটের মধ্যে পড়ছিল। এর মধ্য তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, প্রাণহানি ইত্যাদি সংকট অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। অর্থনীতিবিদেরা ও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা মনে করেন, চলমান সহিংসতা বন্ধ না হলে দেশের অর্থনীতি আরও গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
এদিকে তিন দিন বন্ধ থাকার পর রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ও বস্ত্রকল খুলেছে বুধবার থেকে। কারখানা খুললেও শিল্পকারখানার পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন আছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় এখনো ভাঙচুর হচ্ছে, অগ্নিসংযোগ হচ্ছে। পুলিশ কাজ করতে পারছে না। নিরাপত্তা না দিলে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বড় ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতি কোনো না কোনোভাবে পুষিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেকটা দিন আনেন দিন খান। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তারা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়ে পোষাতে পারবেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, দেশে ২৫ লাখের বেশি খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী আছেন। তাদের বেশির ভাগেরই জীবিকা এখন হুমকির মুখে। টানা তিন দিন বন্ধের পর গতকাল বুধবার বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা চালু হয়েছে। তবে অনেক কারখানাতেই শ্রমিকেরা এসেও কাজ না করে বের হয়ে যান। কিছু এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরের আতঙ্কে কারখানা বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, গতকালও বিসিকসহ বিভিন্ন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার অধিকাংশ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিনও বন্ধ ছিল। এ মুহূর্তে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন আছেন বলে জানান তিনি।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা চাই ব্যবসা করার সুষ্ঠু পরিবেশ। সেজন্য কলকারখানা ও দেশের অর্থনীতি সচল রাখাটা জরুরি। এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, এখনো অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ফলে সরকারকে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কিছু কারখানা ছাড়া বেশির ভাগই খুলেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শুধু ব্যবসার জন্য নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্যও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কারখানা খুলে দেওয়ার সঙ্গে ব্যবসা ধরে রাখার পাশাপাশি সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়ও জড়িত। ফলে কারখানা চালু ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বর্তমানে নিরাপত্তা নিয়ে একধরনের শঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, নিরাপত্তা ও রাজনীতি ঠিক না হলে দেশের অর্থনীতিও ঠিক হবে না। চলমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতি বাঁচাতে রাজনৈতিক সমাধান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন মেট্রোপলিটান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সংগঠনটি মনে করে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগসহ সার্বিক বিনিয়োগে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে তা বাধা সৃষ্টি করবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ ইত্তেফাককে জানান, তিনি রাষ্ট্রপতি ও সেনা প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে আজ বৃহস্পতিবার কারখানা খুলবেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের তারা আশ্বস্ত করেছেন।
