কক্সবাজার প্রতিনিধি : কোভিড-১৯ পূর্ব সময়ে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পর্যটকে টইটম্বুর থাকতো কক্সবাজার। কিন্তু কোভিড পরবর্তী সময়গুলোতে ভাড়া-ই পড়েছে পর্যটনে। তাই অনেক পর্যটন উদ্যোক্তা লগ্নি তুলতে না পেরে বছর বছর কেবল চরম হতাশা-ই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু চলতি শীত মৌসুমের ডিসেম্বর পর্যটনে আবারো আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে পর্যটকের ঢল নেমেছে দরিয়ানগরে।
১৬ ডিসেম্বরের আগে দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে চারদিনের ছুটিতে আশাতীত পর্যটক উপস্থিতি বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতা রয়েছে চলতি সপ্তাহেও। এ ধারা বড়দিন আর থার্টিফাস্ট ছাপিয়ে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত থাকবে, এমনটি আশা করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তবে, অভিযোগ উঠেছে পুরোনো নিয়মে পর্যটকের বাড়তি আগমনে রুম ভাড়া, খাবার বিল, এবং যানবাহনে বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে। করা হচ্ছে আরও না অনিয়ম। এমন অভিযোগে অভিযান চালিয়ে কলাতলীর কটেজ জোনে দু’আবাসিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে জেলা প্রশাসন। এর পরবর্তী এমন অভিযোগ পেলে ব্যবসার অনুমতি বন্ধ করে দেয়া হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ অভিযান আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত করা হবে বলে জানিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মো. তানভীর হোসেন।
শনি ও রবিবার বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতের বেলাভূমিতে ভিড় করেছে লাখো পর্যটক ও দর্শনার্থী। শীত উপেক্ষা করে তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের নীল জলরাশিতে লম্প-জম্প করে নোনাজলে গা ভেজাচ্ছে সমুদ্র প্রেমীরা। অনেকে জেটস্কি করে ঢেউ মাড়িয়ে দূর সাগরে যাচ্ছে। অনেকে আবার ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাজকীয় অনুভূতি উপভোগ করছেন। সেখানেই অনেক পর্যটক বালিতে বিছানা পেতে রেখেছেন লাগেজ ও ব্যাগ। অনেকে আবার অবস্থান নিয়েছেন কিটকটে।
সৈকতে ব্যাগ ও লাগেজ আনার বিষয়ে ঢাকার মিরপুর-১ এলাকার পর্যটক ইমন হোসেন বলেন, পড়া-লেখা শেষ চাকরিতে যোগ দেয়ার আগে আট বন্ধু মিলে ঘুরতে বেরিয়েছি। খাগড়াছড়ি, লামার মিরিঞ্জা ভেলি দেখে কক্সবাজার সৈকতে এসেছি। রাতে টিকেটে ঢাকা ফিরবো, কয়েক ঘণ্টার জন্য রুম নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ৩ হাজার টাকা ভাড়া চাওয়ায় ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে সৈকতে চলে এসে একজন পাহারা দিচ্ছি অন্যরা সৈকতে পা ভেজাচ্ছে।
তাদের মতো, রাতে ফিরে যাবার প্রস্তুতি থাকা অনেকেই লাগেজ নিয়ে বেলাভূমিতে এসেছেন বলে দাবি করেছেন।
এদিকে, কক্সবাজার শহর ও সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, দরিয়ানগর পর্যটন স্পট, হিমছড়ির ঝর্ণা, পাথুরে সৈকত ইনানী-পাটুয়ারটেক, টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, টেকনাফ থানার ঐতিহাসিক প্রেমের নিদর্শন মাথিন কূপ, নেচার পার্ক, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, রামুর বৌদ্ধ বিহারসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও মানুষের জমজমাট সমাগম। কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটের জাহাজেও পর্যটকের জোয়ার লেগেছে।
সৈকতে দায়িত্বপালন করা জেলা প্রশাসনের বিচকর্মী বেলাল হোসেন ও মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, টানা ছুটির সূত্র ধরে কক্সবাজারে ১৩ ডিসেম্বর হতে পর্যটক সমাগম বেড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় চাকরিজীবীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও পরিবার নিয়ে কক্সবাজার আসছেন। অনেকে আগাম বুকিং ছাড়া চলে আসায় সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বাড়তে টাকায় রুম নিতে বাধ্য হয়েছেন।
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক মীর মোহাম্মদ বলেন, সকালের বাসে কক্সবাজার পৌছার পর বাইপাশে পুলিশ লাইনের কাছে নামতে বাধ্য হয়েছি। দীর্ঘ জ্যামের কারণে অনেক পর্যটক ফুটপাত ধরে হেঁটেই কলাতলী যান। আগে রুম বুক না থাকায় একটি কটেজে বাড়তি দামে রুম নিতে হয়েছে। বের হয়ে দেখি রুম ভাড়ার মতো রেস্তোরাঁ এবং যানবাহনও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে।
রাজশাহীর পর্যটক আরিফুল হক বলেন, সকালে কক্সবাজার পৌঁছানোর পর রুম পতে বেলা দু’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে জেনে সৈকতে চলে এসেছি। ধারণার চেয়ে বেশি মানুষ কক্সবাজার সৈকতে। বেলাভূমিতে যেমন মানুষের বিচরণ, ঠিক তেমনি নোনাজলেও।
ঠাণ্ডা বাতাসেও সমুদ্রস্নানে পর্যটকদের বিচরণ বাড়ায় নিরাপত্তায় সচেতনতার পাশাপাশি লাইফ গার্ড কর্মীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সি-সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার ইনচার্জ মোহাম্মদ ওসমান।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজে ভাড়া দেয়ার মতো কোন কক্ষ খালি নেই। বুকিং ছাড়া এসে অনেকে গাতিতে রাত কাটিয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। পর্যটকদের ভিড়ে ৫ শতাধিক হোটেল-গেস্টহাউসের কেউ কেউ অন্য সময়ের চেয়ে দাম বাড়িয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে বাস, ট্রেন ও ফ্লাইটেও একই অবস্থা। ফ্লাইটেও কোন সিট খালি নেই। বিমান ও ট্যুরিজম সাইট গুলোর ফ্লাইট বিভাগে ঢোকাই যাচ্ছে না।
ক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার বলেন, কক্সবাজার সৈকতের নিকটবর্তী ৫ শতাধিক হোটেলে-মোটেলে এক লাখ ৩০ হাজার পর্যটক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। গত কয়েকদিন কোনো হোটেলে কক্ষ খালি যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দাম আদায়ের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে, কোন পর্যটক প্রমাণসহ অভিযোগ করলে প্রশাসনের সহায়তায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিড়ম্বনায় এড়াতে পর্যটকদের কক্সবাজার ভ্রমণের আগে অনলাইনে হোটেল বুকিং দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এ পর্যটন উদ্যোক্তা।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবুল কালাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। সবধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সজাগ রয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সাপ্তাহিক ছুটিসহ অন্যদিনে পর্যটকবাহী ৭-৮ হাজার যানবাহন কক্সবাজার শহরে আসছে-এতে যানজট সৃষ্টি হয়। তবে সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা প্রাণান্ত চেষ্টা করেন বলে দাবি তার।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে। হোটেল কক্ষের ভাড়া ও রেস্তোরাগুলোতে খাবারের দাম অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। শনিবার দিনব্যাপী অভিযানে দু’হোটেল হতে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
